মহাজাগতিক মৌনতা: নীরবতার অদৃশ্য প্রভাব
Fiction YQWE

মহাজাগতিক মৌনতা: নীরবতার অদৃশ্য প্রভাব

By Mokammel MorshedDec 13, 20258 min

ক্রাইম সিন: মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি

গল্পটা শুরু করা যাক একটা সহজ দৃশ্য দিয়ে। ধরুন, আপনি একটা বিশাল স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে আছেন। পুরো স্টেডিয়াম দর্শকে ভর্তি। লাখ খানেক মানুষ। কিন্তু পিনপতন নীরবতা। কেউ কথা বলছে না, কেউ নড়ছে না। এমনকি কারো নিশ্বাসের শব্দও পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতিটা কি স্বাভাবিক? নাকি অসম্ভব রকমের ভুতুড়ে? মহাবিশ্ব হলো ঠিক সেই স্টেডিয়াম। আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি—মহাবিশ্ব অসীম, নক্ষত্র অগণিত। কিন্তু আমরা কখনো খাতা-কলম নিয়ে বসে হিসেব করিনি—এই অসীমের মধ্যে আমরা ঠিক কতটা একা। আসুন, আজ আমরা কোনো গল্প শুনব না, আমরা একটা গাণিতিক রহস্য সমাধান করব। আমাদের গ্যালাক্সির নাম মিল্কি ওয়ে। এর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দূরত্ব ১ লক্ষ আলোকবর্ষ। এর ভেতরে নক্ষত্র বা স্টার আছে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন 4 × 1011

১৯৬১ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ড্রেক একটি সমীকরণ বা ইকুয়েশন তৈরি করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, এই বিশাল গ্যালাক্সিতে কতগুলো বুদ্ধিমান সভ্যতা বা 'এলিয়েন সিভিলাইজেশন' থাকা সম্ভব, তা গাণিতিকভাবে বের করা। একে বলা হয় Drake Equation। সমীকরণটি দেখতে এমন:
N = R* × fp × ne × fl × fi × fc × L
ভয় পাবেন না, আমি ফিজিক্সের ক্লাস নিচ্ছি না। শুধু শেষের অক্ষরটির দিকে তাকান— LL মানে হলো, একটা উন্নত সভ্যতা কতদিন টিকে থাকে (Length of time)। বাকি সব উপাত্ত বা ভেরিয়েবল—যেমন নক্ষত্রের জন্মের হার R*, গ্রহ থাকার সম্ভাবনা fp—এগুলো এখন আমরা কেপলার টেলিস্কোপের কল্যাণে জানি। এই মানগুলো বসালে সমীকরণটি যা দেখায়, তা অবিশ্বাস্য। গণিত বলছে, আমাদের গ্যালাক্সিতে এই মুহূর্তে অন্তত ১০০০ থেকে ১ কোটি সভ্যতা থাকার কথা, যারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম।

১০০০ টা সভ্যতা! অথচ গত ৬০ বছর ধরে আমরা আকাশকে স্ক্যান করছি (SETI Project)। ফলাফল? শূন্য। একটা বড়, গোল্লা। তাহলে সেই ১০০০ সভ্যতা কোথায়? এখানেই রহস্যটা ঘনীভূত হয়। এই 'মিসিং পপুলেশন' বা হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার রহস্য ভেদ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা একটা ভয়ানক সিদ্ধান্তে এসেছেন। তারা বলছেন, সমীকরণে কোনো ভুল নেই। ভুল আমাদের ভাবনায়। আমরা ভাবছি তারা 'নেই'। কিন্তু লজিক বলছে, তারা 'ছিল'। তারা এখন মৃত। এবং তাদের মৃত্যুর কারণ কোনো মহাজাগতিক দানব নয়। কারণটা লুকিয়ে আছে গণিতের আরেকটি ছোট্ট সূত্রের মধ্যে, যা আমরা একটু পরেই রিভিল করব।

দ্য গ্রেট ফিল্টার: এক মহাজাগতিক ছাঁকনি

ফার্মি প্যারাডক্সের (Fermi Paradox) উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা 'দ্য গ্রেট ফিল্টার' থিওরি সামনে আনেন। কল্পনা করুন একটা ছাঁকনি। প্রাণের বিবর্তনের পথে এমন একটা ধাপ আছে, যেটা পার হওয়া প্রায় অসম্ভব। ৯৯.৯৯% প্রজাতি ওই ধাপে এসে আটকে যায় এবং ধ্বংস হয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হলো—ছাঁকনিটা কোথায়? এটা কি আমাদের পেছনে? নাকি সামনে? যদি পেছনে থাকে, তবে আমরা লাকি। আমরা সেই ১% যারা বেঁচে গেছি। কিন্তু যদি সামনে থাকে? তবে আমাদের হাতে সময় নেই। আমরা একটা মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে ঘুরছি। কিন্তু কেন? একটা সভ্যতা কেন ধ্বংস হবে? তারা তো প্রযুক্তি দিয়ে নক্ষত্র জয় করবে, তাই না? এখানেই আমরা আমাদের গল্পের 'সিক্রেট' বা গোপন সত্যটা রিভিল করব। সভ্যতার ধ্বংস কোনো এক্সিডেন্ট নয়। এটা একটা গাণিতিক অনিবার্যতা (Mathematical Inevitability)। এবং এটার প্রমাণ লুকিয়ে আছে হিরোশিমায়।

০.৭ গ্রামের গোপন রহস্য

১৯৪৫ সাল। ৬ আগস্ট। 'লিটল বয়' যখন হিরোশিমার ওপর বিস্ফোরিত হলো, তখন সেখানে ইউরেনিয়াম ছিল ৬৪ কেজি। কিন্তু জানেন কি, ওই ৬৪ কেজির মধ্যে মাত্র ০.৭ গ্রাম (একটা পেপার ক্লিপের ওজনের চেয়েও কম) পদার্থ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল? আইনস্টাইনের সূত্র E=mc2 আমাদের বলে দেয়, সামান্য ভরের ভেতরে কী অসীম শক্তি লুকিয়ে আছে। এখন লজিকটা বুঝুন। মানুষ প্রযুক্তির ক্ষমতা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে (Exponentially)। ১০০ বছর আগে আমরা ঘোড়ার গাড়িতে চড়তাম। আজ আমরা মঙ্গলে রোভার পাঠাচ্ছি। আজ থেকে ১০০ বছর পর আমাদের হাতে ন্যানো-টেকনোলজি এবং অ্যান্টি-ম্যাটার বোমা থাকবে। অর্থাৎ, ধ্বংস করার ক্ষমতা সময়ের সাথে সাথে বাড়ছে।

কিন্তু আমাদের 'বুদ্ধিমত্তা' বা 'প্রজ্ঞা' (Wisdom) কি একই হারে বাড়ছে? না। আমাদের মস্তিষ্ক এখনো ঠিক তেমনই আছে, যেমনটা ৫০,০০০ বছর আগে সাভানার জঙ্গলে ছিল। আমাদের আবেগ, আমাদের রাগ, আমাদের লোভ—সব সেই আদিম স্তরেই রয়ে গেছে। এখানেই সেই 'Fatal Equation' তৈরি হয়: Risk = Technology (Power) / Wisdom (Control)। লব (Power) বাড়ছে অসীম গতিতে। কিন্তু হর (Control) বাড়ছে না। গাণিতিকভাবে, যখন হর ছোট থাকে আর লব বড় হতে থাকে, তখন ভাগফল অসীমের দিকে যায়। অর্থাৎ, ঝুঁকি = অসীম। অন্য গ্রহের সেই ১০০০ সভ্যতাও ঠিক এই পথেই হেঁটেছিল। তারাও আগুন আবিষ্কার করেছিল। তারা বাষ্পীয় ইঞ্জিন বানিয়েছিল। তারা পরমাণু ভেঙেছিল। এবং ঠিক যেই মুহূর্তে তাদের প্রযুক্তি তাদের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে গেল—যেই মুহূর্তে তারা 'গড-লাইক পাওয়ার' পেল 'আদিম ইমোশন' দিয়ে কন্ট্রোল করার জন্য—ঠিক তখনই তারা ফিল্টারে আটকা পড়ল। তাদের নিজেদের আবিষ্কারই তাদের খেয়ে ফেলল।

মস্তিষ্কের ত্রুটি: দ্য সাইলেন্ট কিলার

কিন্তু কেন? তারা কি বুঝতে পারেনি যে তারা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে? তারা কি স্মার্ট ছিল না? ছিল। কিন্তু তাদের (এবং আমাদের) বায়োলজিক্যাল ব্রেইনে একটা বড়সড় 'ডিজাইন ফল্ট' আছে। কগনিটিভ সায়েন্সের একটা নতুন থিওরি আছে, নাম "The Argumentative Theory of Reasoning"। সহজ ভাষায়, বিবর্তন আমাদের মস্তিষ্ককে 'সত্য' (Truth) খোঁজার জন্য তৈরি করেনি। তৈরি করেছে 'তর্ক' (Argument) জেতার জন্য। খেয়াল করে দেখবেন, আপনি যখন কোনো ভুল কাজ করেন, আপনার মস্তিষ্ক সাথে সাথে অজুহাত তৈরি করে ফেলে। আপনি জানেন আপনি ভুল, তবুও আপনি তর্কে জিততে চান। একে বলা হয় Confirmation Bias

এখন ভাবুন, একটা গ্রহের নেতারা, যাদের হাতে পারমাণবিক বোমার সুইচ, তারা যদি 'সত্য' খোঁজার বদলে 'তর্কে জিততে' চায়—তাহলে কী হবে? তারা একে অপরকে বিশ্বাস করবে না। একে বলা হয় "Chain of Suspicion"। ওরা ভাববে, “ও আমাকে মারার আগে আমি ওকে মেরে ফেলি।” এই আদিম ভয় আর আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণই হলো সেই 'গ্রেট ফিল্টার'। আমরা মঙ্গলে কেন কোনো প্রাণের সাড়া পাই না? কারণ মঙ্গল হয়তো কোটি বছর আগে আমাদের মতোই ছিল। হয়তো সেখানেও কেউ একজন ভাবছিল—“আমরাই সেরা।” তারপর একদিন কেউ একজন একটা ভুল বোতামে চাপ দিল। আজ মঙ্গল কেবল লাল ধুলোর একটা মৃত গ্রহ—কোনো ইতিহাস নেই, কোনো স্মৃতি নেই।

আমরা কি একাকীত্বের কয়েদি?

অক্সফোর্ডের ফিলোসফার নিক বোস্ট্রম বলেছিলেন, "No news is good news." আমরা যদি মঙ্গলের মাটিতে ব্যাকটেরিয়া খুঁজে পাই, সেটা হবে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ। কেন? লজিক্যালি ভাবুন। যদি মঙ্গলে প্রাণ (ব্যাকটেরিয়া) পাওয়া যায়, তার মানে প্রাণ সৃষ্টি হওয়া খুব সহজ। মহাবিশ্বে এটা কমন। তার মানে, 'গ্রেট ফিল্টার' প্রাণের শুরুতে নেই। ফিল্টার পেছনে নেই। তাহলে ফিল্টার কোথায়? সামনে। অর্থাৎ, কোনো সভ্যতা উন্নত হওয়ার পর ধ্বংস হওয়াটাই নিয়ম। আমরাও সেই নিয়মের ব্যতিক্রম নই।

আমরা এখন কারদাশেভ স্কেলের টাইপ-০.৭৩ অবস্থানে আছি। আমরা এখনো টাইপ-১ হতে পারিনি। টাইপ-১ হওয়া মানে হলো নিজের গ্রহের সমস্ত শক্তি নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু আমরা এখন এমন এক 'টিনএজ' স্টেজে আছি, যেখানে বাবার পিস্তল হাতে পেয়ে গেছি, কিন্তু পিস্তল চালানোর ম্যাচিউরিটি আসেনি।

১৯৬২ সালে কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস-এর সময় আমরা ধ্বংসের কত কাছে গিয়েছিলাম জানেন? মাত্র একজন রাশিয়ান সাবমেরিন অফিসারের (Vasily Arkhipov) সিদ্ধান্তের ওপর পুরো পৃথিবীর ভাগ্য ঝুলে ছিল। ৯৯% সম্ভাবনা ছিল নিউক্লিয়ার ওয়ার হওয়ার। আমরা ১% লাকের কারণে বেঁচে গেছি। গণিত বলছে, আপনি বারবার লাকি হতে পারেন না। Luck runs out। তাই ফার্মি প্যারাডক্সের সমাধান কোনো এলিয়েন লুকিয়ে থাকা নয়। সমাধান হলো— তারা সবাই মৃত। এবং আমরাই পরবর্তী।

শেষের আগের দৃশ্য

রাতের আকাশের দিকে তাকান। এখন কি সেই সৌন্দর্য দেখছেন? নাকি একটা বিশাল টাইম-মেশিন দেখছেন? আমরা যখন তারার দিকে তাকাই, আমরা আসলে অতীতে তাকাই। ওই তারাগুলোর আলো আসতে কোটি বছর সময় লেগেছে। হয়তো ওই নক্ষত্রের পাশে যে গ্রহটি ছিল, সেটি অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা কেবল তার 'ভূত' বা 'Ghost Image' দেখছি। মহাবিশ্ব চুপ করে আছে, কারণ সে জানে। সে দেখেছে অসংখ্য সভ্যতাকে উঠতে এবং পড়তে। আমরা এখন এক পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সামনে দুটি রাস্তা: ১. আমরা আমাদের বায়োলজিক্যাল ব্রেইনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠব, নিজেদের 'তর্কপ্রিয়' স্বভাব বদলে 'যৌক্তিক' হব। ২. অথবা, আমরাও সেই ১০০০ সভ্যতার মতো মহাজাগতিক ইতিহাসে একটা ফুটনোট হয়ে থাকব— "এখানে একটা প্রজাতি ছিল, যারা নক্ষত্র ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখত, কিন্তু নিজেদের আগুনেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।" ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে। টিক-টক... টিক-টক... আমাদের হাতে সময় খুব কম। ফিল্টার অপেক্ষা করছে।

পরবর্তী পর্বে: এই অন্ধকার অরণ্যে যদি কেউ বেঁচেও থাকে, তবে তারা চুপ কেন? কেন স্টিফেন হকিং বারবার সতর্ক করেছিলেন মহাকাশে সিগন্যাল না পাঠাতে? আমরা জানব 'ডার্ক ফরেস্ট থিওরি'র হাড়হিম করা ব্যাখ্যা এবং দেখব মহাবিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণীদের—যারা আমাদের চেনা সংজ্ঞার বাইরে।

Frequently Asked Questions